Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

ননীগোপাল চক্রবর্তী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

      ভূতের গল্প বল আজ—ছেলেরা ধরল চরকা বুড়ীকে। ভূত? ভূত তো কবে সব পালিয়ে গেছে তোদের উৎপাতে। না, সব ভূত পালায়নি, বলল একটি ছেলে। আমাদের গাঁ...

      ভূতের গল্প বল আজ—ছেলেরা ধরল চরকা বুড়ীকে। ভূত? ভূত তো কবে সব পালিয়ে গেছে তোদের উৎপাতে।
না, সব ভূত পালায়নি, বলল একটি ছেলে। আমাদের গাঁয়ের একটি মেয়েকে ধরেছিল বাঁশ ঝাড়ের ভূতে। ওঝা এসে ভূত চালান দিয়ে তাকে ভালো করে দেয়। আচ্ছা, এত গাছ থাকতে বাঁশ গাছে ভূত থাকে কেন? জিজ্ঞাসা করে আর একজন।
     চরকা বুড়ী চরকা কাটে আর বলে—সবই বলছি, শোন। ভূত চালানো সহজ নয়। ওর বিপদ অাছে অনেক। বড় বড় ওঝাদের এজন্য উচাটন, বিতাড়ন সব রকম বিছে শিখতে হয়। ভূতসিদ্ধ যারা, তারা উচাটন মন্ত্রে ভূতকে নামায়, আবার বিতাড়ন মন্ত্রে তাকে তাড়িয়ে দেয়।
     এই উচাটনের মন্ত্র-তন্ত্র শিখতে লাগে পুরো দশটি বছর অার বিতাড়নের মন্ত্র-তন্ত্র শিখতেও লাগে কমসে কম আরও দশ বছর। এই বছর কুড়ি ধৈর্য ধরে যারা গুরুর কাছে পড়ে থাকতে পারে—তারাই হয় ভূত মন্ত্রে সিদ্ধ।
      কিন্তু তা তো হয় না। আমাদের ধৈর্য কৈ? আমরা সব কিছুই ফাঁকি দিয়ে অল্পের মধ্যে সারতে চাই ।
     ওঝাদের বেলাতেও তাই। বছর কয়েক তাড়াতাড়ি করে উচাটন মন্ত্র শিখে, তারা আর বিতাড়ন মন্ত্র শিখতে চায় না। ভাবে, তারা সব শিখে ফেলেছে। তার ফল হয় সাংঘাতিক।
     উচাটন মন্ত্রে ভূত আসে, কিন্তু একটা শর্ত—সর্বক্ষণ তাকে কাজ দিতে হবে। কাজ না দিলে, অথবা বিতাড়ন মন্ত্রে তাকে তাড়াতে না পারলে, সে তোমার ঘাড় মটকে চলে যাবে। কত ওঝার এইভাবে অপঘাতে মৃত্যু হয়েছে।
      একবার হয়েছিল কি, এক ওঝা পূর্ণ সিদ্ধ হওয়ার আগেই উচাটন মন্ত্রে ভূতকে আবাহন জানাল। তার আর দেরি সইছিল না।
      ব্যস্‌ ভুত এসে উপস্থিত। উপায়? কাজ চাই তো! ভেবে চিন্তে তো সে ভুতকে ডাকনি।
      ওঝা বলল, বাড়ী করে দাও, পুকুর কাটাে। অমনি সঙ্গে সঙ্গে পুকুর, বাড়ী-ঘর সব হয়ে গেল। তারপর? ওঝার আর কোন কাজের কথা মনে পড়ে না। কিন্তু কাজ দিতেই হবে ভূতকে, নইলে—
      ওঝা তাড়াতাড়ি বলল,—জল আনো।
      ভূত জল আনছে তো আনছেই। জলে থৈ থৈ। চারদিক জলে ডুবুডুবু। উপায়?
      তখন বুদ্ধি করে ওঝা বলল, সব জল তুলে ফেল । কিছুক্ষণের মধ্যেই সব জল তুলে ফেলল ভূত। এবার? কাজ না দিতে পারলে এখনই তো তার ঘাড়টি মটকে মেরে ফেলে দেবে—কিন্তু এত কাজই বা কোথায়?
      এমন উভয় সংকটের মধ্যে পড়েও লোকটির মাথায় ধাঁ করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল।
      ভূতকে সে কি করতে বলল, বল দেখি তোরা?—জিজ্ঞাসা করল চরকাবুড়ী।
      ছেলেরা তখন এ-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
      একজন বলল, ভূতকে ওঝা বলুক, দৌড়ে পালাও এখান থেকে এক্ষুনি— আপদ বিদায় হোক।
     চরকাবুড়ী ঘাড় নেড়ে বলল,—উহু, ওটি হবে না। একমাত্র বিতাড়ন মন্ত্রেই তাকে বলা যাবে—পালাও। বিতাড়ন মন্ত্র যে জানে না, তাকে কেবল কাজ দিয়ে যেতে হবে ভূতকে—বেকার থাকবে না সে এক মুহূর্তও।
      চরকার সুতোটা ঠিক করে নিয়ে বুড়ী বলল,—চট্‌ করে ওঝার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল! সে ভূতকে বলল, ঝাড় থেকে খুব বড় দেখে একটা বাঁ কেটে আনো।
      বাঁশ এলো।
       ওঝা বলল,—ঐ ফাঁকা জায়গায় বাঁশটা পোঁতো। পোঁতা হলো সঙ্গে সঙ্গে।
     ওঝা হুকুম করে বলল, ঐ বাশের মাথায় ওঠে। আর নামো। আজ পর্যন্ত ভূত তাই করছে। সেই একটা বাঁশ থেকে কত বাঁশ, কত ঝাড় ঝাড় বাঁশ হয়েছে। ভূত আজও তাই বাঁশ ঝাড়েই ওঠা-নামা করে।

      একজন লোক তীর্থ করতে যাবে। তার কিছু টাকা ছিল। টাকাটা রাখবে কোথায়? অনেক ভেবেচিন্তে সে ঠিক করল, তার এক বন্ধুর কাছে টাকাটা গচ্ছিত রেখে যা...

      একজন লোক তীর্থ করতে যাবে। তার কিছু টাকা ছিল। টাকাটা রাখবে কোথায়? অনেক ভেবেচিন্তে সে ঠিক করল, তার এক বন্ধুর কাছে টাকাটা গচ্ছিত রেখে যাবে।
      বন্ধু বলল, তা রেখে যাও। তোমার টাকা আমার কাছে রাখাও যা, তোমার কাছে রাখাও তাই। ফিরে এসে দরকার মত চাইলেই পাবে।
     অনেকদিন পরে তীর্থ থেকে ফিরে এসে লোকটি তার টাকা ফেরত চাইল বন্ধুর কাছে। বন্ধু তা শুনে যেন গাছ থেকে পড়ল। বলল, সে কি, আমি তো তোমার টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছি।
      বন্ধুর বেইমানিতে লোকটির বড় রাগ হলো। সে নালিশ করল গিয়ে রাজার কাছে।
     রাজা পড়লেন মুস্কিলে। তিনি দেখলেন, ঐ লোকটি যে টাকা রেখেছিল বন্ধুর কাছে, তার কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই। যদি রেখেই থাকে, বন্ধুটি যে টাকা ফেরত দিয়েছে, তারও কোন সাক্ষী নেই।
      রাজা ছিলেন মনসার ভক্ত। মনসার মন্দির ছিল একটা তার বাড়ীতে। রাজা বিপদে আপদে পড়লে মনসা তাকে সাহায্য করত।
      রাজা তার পাত্ৰ-মিত্র সভাসদদের নিয়ে অনেক আলোচনা করলেন, কিন্তু ঐ লোকটি অার তার বন্ধুর মধ্যে কে মিথ্যেবাদী তা কেউই বলতে পারল না।
      রাজা সারারাত ভাবলেন, কিন্তু সমস্যার সমাধান হল না। অবশেষে রাজা জানান দিলেন মনসাকে।
      মনসা এক বিরাট বিষধর সাপকে পাঠিয়ে দিলেন। এই সাপের সম্মুখে শপথ করে যে মিথ্যা কথা বলবে, সাপ তাকে এক ছোবলে সেখানেই শেষ করে দেবে। যে মিথ্যা কথা বলবে না, সাপ তাকে ছোবল মারবে না।
      সাপ এল। কুন্ডলী পাকিয়ে রাজসভার মাঝখানটায় সে ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। লোকে লোকারণ্য। সাপের সেই লকলকে জিহ্বার দিকে তাকিয়ে সকলেরই প্রাণ উড়ে গেল।
       কে মিথ্যেবাদী—ঐ লোকটি, না তার বন্ধু? সকলের মুখেই এক কথা।
      লোকটি সাপের সম্মুখে শপথ করে বলল, সে তীর্থে যাওয়ার আগে বন্ধুর কাছে টাকা গচ্ছিত রেখে গিয়েছিল কিন্তু বন্ধু সে টাকা তাকে ফেরত দেয়নি। সাপ মাথা তুলাতে লাগল। তাকে কিছু বলল না। সকলেই বুঝল, এ ব্যক্তি মিথ্যে কথা বলেনি। ও যে টাকা রেখে গিয়েছিল বন্ধুর কাছে, একথা সত্যি।
      এবার বন্ধুর পালা। হাজার হাজার লোক। উদ্‌গ্ৰীব হয়ে বিচার দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এবার সাপের ছোবল থেকে ঐ বন্ধুটিকে কেউ বাঁচাতে পারবে না, তা সবাই বুঝে নিল।
      বন্ধুটিরও ভয়ে মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে তখন। অনেকে ভাবল, সে এবার এক দৌড়ে পালিয়ে যাবে সাপের কাছ থেকে।
      কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? রাজরোষে পড়লে কারও রক্ষা নেই। রাজা তাকে ধরে হয় ফাঁসী দেবে, না হয় শূলে চড়াবে।
      বন্ধুটি কিন্তু পালাল না। সে ঐ লোকটির কাছে বিদায় নিতে গিয়ে তার পিঠে হাত দিল। তারপর তার হাত ধরে সাপের কাছাকাছি এসে নিজের হাতের লাঠিটা ওকে ধরতে দিয়ে এগিয়ে গেল সাপের কাছে।
      সমস্ত লোক তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে ভাবছে, সাপের ছোবল খেয়ে এবার মরবে এই শয়তান বন্ধুটি।
     সে শপথ করে সাপের সম্মুখে বলল, আমি টাকা গচ্ছিত রেখেছিলাম সত্যি, কিন্তু সে টাকা ওকে আমি দিয়ে দিয়েছি। সে টাকা অামার কাছে নেই, ওর কাছেই আছে।
      সাপটি ফুলে ফুলে উঠতে লাগল রাগে, কিন্তু তাকে ছোবল মারল না। খুব জোর একটা লেজের ঝাপটা মেরে চলে গেল সভা ছেড়ে।
      সমস্ত লোক অবাক হয়ে গেল। প্রকৃত মিথ্যেবাদীর হদিশ হলো না!
     বন্ধুটি ফিরে এসে লোকটির হাত থেকে তার লাঠিটা নিয়ে বাড়ী যাবে, এমন সময় রাজা বললেন, ওহে, আমার সঙ্গে এক্ষুনি একবার দেখা করে যেও তো।
     সে রাজার সঙ্গে দেখা করলে রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বাপুহে, তুমি যদি সত্যিই নির্দোষ হবে, তাহলে লেজের ঝাপটা, কেন খেলে বল দেখি!
      লোকটি হাত জোড় করে বলল, মহারাজ, যদি অভয় দেন তা হলে বলতে পারি।
      রাজা বললেন, বল। 
     বন্ধুটি কি বলল, বলতে পারিস তোরা? জিজ্ঞাসা করে চরকা বুড়ী। ছাই পারিস। বল তো, লেজের ঝাপটা খেল কেন?
      তবে শোন। লোকটি বলল, ধর্মাবতার, অামার হাতের লাঠির মধ্যে ওর সে টাকা ছিল। সাপের কাছে যাওয়ার আগে ওর হাতেই দিয়ে গিয়েছিলাম সে লাঠি। শপথ করে আমি মিথ্যে বলিনি। তবে ঐ চালাকীটার জন্যই খেতে হলো লেজের ঝাপটা৷

      এক তাঁতী আর তার বৌ। দিনরাত খটাখট— না, তাঁত বোনার খটাখট্‌ শব্দ নয়—ঝগড়ার খট্‌খটানি। ওটা তাদের মধ্যে লেগেই আছে!       শাকের ক্ষেতে গরু ...

      এক তাঁতী আর তার বৌ। দিনরাত খটাখট— না, তাঁত বোনার খটাখট্‌ শব্দ নয়—ঝগড়ার খট্‌খটানি। ওটা তাদের মধ্যে লেগেই আছে!
      শাকের ক্ষেতে গরু ঢুকেছে। তাঁতী বলে, আমি তাঁত বুনছি। তাঁতী-বৌ তুই গরু তাড়া।
      তাঁতী-বৌ বলে, আমি রান্না করছি। গরজ থাকে তুমি তাড়াও।
      তাঁতী বলে, আমি পারব না।
      তাঁতী-বৌ বলে, আমি নড়ব না ।
      তাঁর্তী বলে, আমার জড়ানো কাপড় খুলে যাবে।
      তাঁতী-বৌ বলে, আমার চড়ানো রান্না পুড়ে যাবে !
      কেউ তারা গরু তাড়াতে যায় না। শাক ক্ষেত সাবাড় করে গরু চলে যায়!
      খদ্দের এসেছে ভোরে কাপড় কিনতে।
      তাঁতী বলে, তাঁতী-বৌ দোর খোল।
      তাঁতী-বৌ বলে, কেন কর গণ্ডগোল।
      সে পাশ ফিরে শোয় ।
     জিদ ওদের কম নয়। কেউ আগে দোর খুলবে না। দোর খোলা হয় না। রোদ্দুর চারদিকে চমচম করে৷ খদ্দের ফিরে যায়।
      দুপুর হয়ে যায়, তবু তারা দোর খোলে না। পাড়াপড়শীর ভাবে কি হ’ল, ওদের বাড়ী এমন চুপচাপ কেন। লাঠি দিয়ে বাইরের থেকে দোর খোলে তারা। তখন তাঁতী আর তাঁতী-বৌ ঘর থেকে বেরোয়।
      ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে গিয়েছিল তাঁতী। তিনটে কৈ মাছ পেয়েছে সে। বাড়ী এসে তাঁতী-বৌকে দিল সেই মাছ রান্না করতে। তাঁতী-বৌ মাছ তিনটে কুটে রান্না করল।
      খাওয়ার সময় তাঁতী বলে, আমাকে দুটো কৈ দে আর তুই নে একটা ।
      তাঁতী-বৌ চক্ষু কপালে তুলে বলে, কেন? এত আধিক্যেতা তোমার কি জন্যে শুনি?
      আমি কত কষ্ট করে মাছ ক’টা ধরে এনেছি— তাঁতী-বৌ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে,—আহা! শুনে মরে যাই! না। আমি কত কষ্ট করে মাছ কুটেছি, রান্না করেছি। আমি খাবো দুটো কৈ আর তুমি খাবে একটা। তাঁতী রেগে-মেগে বলে, না, কক্ষনও না। আমিই দুটো খাবো।
      কথা কাটাকাটির পর হাতাহাতির উপক্রম! শেষটায় ঠিক হলো,—যে আগে কথা বলবে সেই খাবে একটা কৈ৷ গুম হয়ে থাকল দু’জনেই। কেউ কোন কথা বলে না! রান্নাভাত হাঁড়িতেই থাকল। কৈ মাছের ঝোল পড়ে থাকল কড়াইতে ঢাকা দেওয়া।
      বাড়ীতে আর টু শব্দ নেই,–কথা বললেই তাকে খেতে হবে একটা কৈ। কিন্তু একটা খেতে ওদের কেউই রাজী নয়।
      তাঁতী-বৌয়ের আদরের পোষা বিড়ালটা ম্যাও ম্যাও করে কড়াইয়ের কাছে ঘুরে বেড়াল। তারপর ক্ষিদের জ্বালায় বেরিয়ে গেল বাড়ী থেকে।
      তাঁতী চুপ করে শুয়ে রইল ঘরের মধ্যে। তাঁতী-বৌ এক পাশে মাদুর বিছিয়ে পড়ে থাকল। কারও মুখে কোন কথা নেই!
      একদিন যায়, দু'দিন যায়। পাড়ার লোকে ভাবে, এটা কেমন হলো?—পাড়াটা একেবারে চুপ মেরে গেল যে! ওরা কি বাড়ী ছেড়ে চলে গেল নাকি দু’জনে?
       তিন দিনের দিন পাড়ার লোকে গিয়ে দেখে, তাঁতী আর তাঁতী-বৌ মরার মত চোখ বুজে পড়ে আছে দু’জায়গায়!       তারা কত ডাকাডাকি করল কিন্তু উত্তর দিল না কেউ। উত্তর দেবেই বা কি করে? যে উত্তর দেবে তারই তো আগে কথা বলা হবে। আগে কথা বললে সে তো আর দুটো কৈ পাবে না, একটা কৈ খেতে হবে তাকে।
      চার দিনের দিন পাড়াপাড়শীরা ওদের মরা মনে করে মাদুর দিয়ে জড়িয়ে শ্মশানে নিয়ে চলল। তখনও ওরা কেউ কথা বলে না। অবশেধে চিতা সাজিয়ে তার উপর ওদের যখন তুলে দেবে, তাঁতী-বৌ তখনও নির্বাক।
      কিন্তু তাঁতী দেখল, খুব বেগতিক। পুড়ে যদি ছাই হয়ে গেলাম, তা হলে দুটাে কৈ খাবে কে? দূর ছাই! সে তাড়াতাড়ি চিতার উপর থেকে বলে উঠল, ওরে তোরা আমায় পোড়াসনে, আমি একটাই খাবো।
      তাঁতী-বৌ তখন তাড়াতাড়ি উঠে বসে মাথার কাপড়টা টেনে দিল।

চরকা বুড়ী গুড়ি গুড়ি হাঁটে লাঠি নিয়ে।  কেউ জানে না কোন জন্মে কার সাথে তার হয়েছিল বিয়ে!       অথচ তার বিয়ের কথায় বুড়ী পঞ্চমুখ ।      ...

চরকা বুড়ী গুড়ি গুড়ি
হাঁটে লাঠি নিয়ে। 
কেউ জানে না কোন জন্মে কার সাথে তার
হয়েছিল বিয়ে!
      অথচ তার বিয়ের কথায় বুড়ী পঞ্চমুখ ।
      একশোজন লাঠিয়াল নিয়ে বর এলো তাকে বিয়ে করতে। তাদের হাতে লাঠি, মাথায় ঝাঁকড় চুল।
    গায়ের মোড়ল ছিল বুড়ীর বাবা। সকলে একজোটে বলল,— এত লাঠিয়াল নিয়ে বিয়ে করতে আসা মানে মোড়লকে ভয় দেখানো। এটা মোড়লের অপমান, গাঁয়েরও একটা নিন্দে। কেন ? আমরা কি বেঁচে নেই? অামাদের ঘরেও কি লাঠি নেই?
      কি করা যায়!
      মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ল। অমনি জড়ো হ’য়ে গেল দুশো লাঠিয়াল সেই রাতেই। তাদের মাথায় লাল গামছা। গোঁফে চাড়া দিয়ে লাঠি হাতে লাইন করে তারা দাঁড়িয়ে গেল।
      বিয়ে বাড়ী খুব হৈ চৈ । খাওয়া-দাওয়া, বাজি-বাজনা।
     পথ চলতি ভিন গাঁয়ের একটি লোক জিজ্ঞাসা করল—ব্যাপার কি? এত লাঠিয়াল কেন? উত্তর হলো, মোড়ল মশায়ের বাড়ী বিয়ে।
      বিয়ে হচ্ছে কার সাথে?
      কে একজন উত্তর করল, মোড়ল মশায়ের মেয়ের সাথে।
      বরের বাবা একথা শুনে মহাখাপ্পা। বলে, কভি নেহি, বিয়ে হচ্ছে আমার ছেলের সাথে।
      মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে হচ্ছে, না ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে প্রশ্নটা দাঁড়াল এই।
      ঝাঁকরা-চুল পালোয়ানরা বলে, ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। মাথায় লাল গামছা লাঠিয়ালরা বলে, মেয়ের সাথেই ছেলের বিয়ে হচ্ছে।
      মহা হট্টগোল।
      মন্তর পড়তে পড়েত পুরুত ঠাকুর থেকে গেলেন। বর পক্ষের দাবী,—আগে বিচার হোক কার সাথে কার বিয়ে হচ্ছে, তারপর বিয়ে।
      ডাক পড়ল বড় বড় মাথাওয়াল লোকের। তারা দুপুর রাত অবধি শাস্ত্র ঘেঁটে অনেক তর্ক-বিতর্কের পর বললেন,—দু’জনেরই সাথে বিয়ে হচ্ছে।
      কিন্তু বরের বাবা তাতে খুশী নয়। এ হতেই পারে না। মেয়েছেলে কি বেটাছেলেকে বিয়ে করতে পারে নাকি? পুরুষের উপর দিয়ে যাবে মেয়ে। তারপর হুঙ্কার দিয়ে বলল,—অামার ছেলে যদি বাপকা বেটা হয় তা হলে এখনই—
     বরপক্ষের একশো লাঠিয়াল অমনি মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় লাল গামছা-বাঁধা দু’শো লাঠিয়াল গর্জে উঠল,—এখনই কি?
      বরপক্ষের পালোয়ানরা বলে—বিয়ের আসর থেকে জোর করে নিয়ে যাবো মেয়েকে—
      কন্যাপক্ষের লাঠিয়ালরা বলে—ঝাঁকড়াচুলো মাথাগুলো সব রেখে দেবো এখানে।
      কথা কাটাকাটি, তারপর লাঠালাঠি। বেঁধে গেল দাঙ্গা। তুমুল কাণ্ড।
     কুটুম্বরা ছাতি ফেলে পালাল, নিমন্ত্রিতেরা খালি পেটে পালাল, রান্নার লোক উনুন ফেলে পালাল। ঢাকি তার ঢাক ফেলে পালাল, শানাইওয়ালা শানাই ফেলে পালাল, পুরুত গামছা ফেলে পালাল, এয়োরা বরণ ডালা ফেলে পালাল।
      ভোর হয়ে গেল। 
      গাঁয়ের আর আর পাঁচজনের চেষ্টায় দাঙ্গা থামলে যারা যার পালিয়েছিল সবাই ফিরে এল,—এল না কেবল বর আর কনে।
      খোঁজ-খোঁজ-খোঁজ—কোথায়ও তাদের হদিশ মিলল না, একেবারে বেপাত্তা!
     বরের বাবা মেয়ের বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, বেয়াই, অামার ছেলে তোমার মেয়ের সাথেই গেছে কোথায় চলে!       মেয়ের বাবা ছেলের বাবার গলা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বিয়াই গো, অামার মেয়ে তোমার ছেলের সাথেই গেছে কোথায় পালিয়ে।
      কার সাথে কে গেল ঠিক হলো না কিছু। এই হচ্ছে চরকাবুড়ীর বিয়ের ইতিহাস। বুড়ী যেন একটা গল্পের ঝুলি! চরকা কাটে আর গল্প বলে। ছেলেমেয়েরা তাকে ঘিরে ধরে। তারা একমনে গল্প শোনে আর তুলোর বীজ ছাড়ায়।
     রাত্রে বুড়ীর ভালো ঘুম হয় না । শুয়ে শুয়ে বুড়ী রোজ রাত্তিরে তার গল্পের মুসাবিদা করে রাখে, সকালেই তা বলতে হবে ছেলেমেয়েদের ; এক গাঁয়ে ছিল তিন জন ঠক। তারা ফাঁকি দিয়ে লোকের জিনিষপত্তোর নিয়ে নিত। তারা সবাই নিজেকে সব চাইতে বড় চালাক মনে করত। এই নিয়ে তাদের ঝগড়া হ’ল একদিন। একদিন গেল তারা তাদের গুরুর কাছে—কে বড় চালাক তাই জানতে। গুরু বলল, কাজ না দেখে কি বলা যায়! তোমরা বেরিয়ে পড়, কে কি বাগালে আমাকে এনে দাও। সব শুনে তবেই তো আমি বলব, কে বড় চালাক?
      ঠকেরা বেরিয়ে পড়ল একসঙ্গে ।
    কতদূর গিয়ে এক মাঠের মধ্যে তারা দেখে, গাধার পিঠে চড়ে একটি লোক যাচ্ছে। তার সঙ্গে অাছে একটি রামছাগল। তার গলায় ঘণ্টা বাঁধা। ছাগলের দড়ি গাধার লেজের সঙ্গে আটকানো। ছাগলটি গাধার পিছন পিছন হাঁটছে আর ঠন্‌ ঠুন করে ঘণ্টা বাজছে। প্রথম ঠক বলল, আমি ওর ছাগলটাকে চুরি করব। দ্বিতীয় ঠক বলল, আমি ওর গাধাটাকে বাগিয়ে নেবো। তৃতীয় ঠক বলল, আমি ওর পরণের কাপড়খানি লোপাট করব।
      এদিকে এক চোর বুড়ীর ঘরে চুরি করতে এসে একমনে তার সেই সব গল্প শোনে। তারপর কি হলো, পরণের কাপড়খানি কি ভাবে লোপাট করল জানবার জন্য, চুরি করার কথা সে ভুলেই যায়।
      এদিকে রাত ফর্স হয়ে আসে।'